বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় চলতি আগস্টে অঞ্চলটির তেল রপ্তানি প্রায় ৩৯ শতাংশ কমেছে।
তেল সরবরাহে এই সংকটের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ায় গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
তেলবাহী জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছিল। আগস্টে সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
চলতি বছরের মে মাসে রপ্তানির ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায়। সে সময় যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তবে আগস্টে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মে মাসে দৈনিক ঘাটতি যেখানে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ব্যারেল ছিল, আগস্টে তা কমে প্রায় ৭২ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কয়েক দশকের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের অন্যতম বড় সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের একটি অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করছে।
গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ৪৮ ডলার। সপ্তাহজুড়ে দুই ধরনের তেলের দামই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তেলের পাশাপাশি ডিজেলের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পাশাপাশি রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার ঘটনাও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে ফসল কাটার ও বীজ বপনের মৌসুম শুরু হওয়ায় ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির প্রভাব তেলের ভবিষ্যৎ দামের পূর্বাভাসেও পড়েছে। সিটি গ্রুপ চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্টের গড় দামের পূর্বাভাস ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৬ ডলার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হতে আগের ধারণার চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
অন্যদিকে, এএনজেডের বিশ্লেষকেরা স্বল্পমেয়াদে ব্রেন্টের সম্ভাব্য দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
সূত্র: রয়টার্স