ডিমের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত মুনাফা পরিহার করে যৌক্তিক দামে বিক্রির আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে যৌক্তিক মুনাফার পাশাপাশি ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সভায় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিমের দাম কমে আসতে পারে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ডিমের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় এসব কথা উঠে আসে। এতে ডিম ও পোলট্রি খাতের ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা অংশ নেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ডিম সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। তাই ভোক্তাকে যেন অযৌক্তিকভাবে বেশি দাম দিতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক মুনাফার পক্ষে অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসার নামে অস্বাভাবিক মুনাফা, কৃত্রিম সংকট কিংবা সরবরাহে অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ নেই। সারা বছর ডিমের দাম স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ব্যবধান পর্যালোচনার তাগিদ দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার কোন ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বা অতিরিক্ত মুনাফা যুক্ত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ জন্য উৎপাদক, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সমন্বিত সহযোগিতা দরকার।
সভায় ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, ভুট্টা, সয়াবিনসহ পোলট্রি খাদ্যের বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়ায় একটি ডিম উৎপাদনে এখন প্রায় ১১ টাকা খরচ হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে উৎপাদক পর্যায়ে প্রতি ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ৭ টাকা ৯১ পয়সা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। উৎপাদক থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সাধারণত আরও দেড় থেকে দুই টাকা যুক্ত হয় বলে জানান তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বছরের বড় একটি সময় উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করতে হয়। অথচ দাম বাড়ার সময়টিই বেশি আলোচনায় আসে। মৌসুমি ওঠানামা কমাতে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় ডিম এক থেকে দেড় মাস সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তাঁরা।
একই সঙ্গে টার্নওভার কর ও আয়করের চাপ যৌক্তিক করা, পোলট্রি খাদ্যের উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা কমানোর সুপারিশ করেন ব্যবসায়ীরা। বাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে প্রতিদিনের উৎপাদন, সরবরাহ ও দামের তথ্য প্রকাশের প্রস্তাবও দেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের পর বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, খাতটির যৌক্তিক সমস্যা ও সুপারিশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। তবে কোনো পক্ষ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে চায়। লক্ষ্য হলো উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য, ব্যবসায়ীর যৌক্তিক মুনাফা এবং ভোক্তার সহনীয় দামে ডিম কেনার সুযোগ নিশ্চিত করা। কৃত্রিম সংকট, সরবরাহে অস্বাভাবিক বাধা বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ উল্লাহ, কাজী ফার্মস লিমিটেডের পরিচালক কাজী জিসান হাসান, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান এবং ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মশিউর রহমান।
এ ছাড়া অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নির্বাহী কমিটির সদস্য আফতাব আলম, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বিপিআইসিসি ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মো. নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাফির রহমান উপস্থিত ছিলেন।