ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ঠেকানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে শুরু হওয়া এই সংঘাত ইতোমধ্যে সাত মাসে গড়িয়েছে। দীর্ঘ সময়ের এই যুদ্ধে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
তবে এত প্রাণহানি ও ধ্বংসের পরও যুদ্ধটিকে তুলনামূলক ছোট ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরান সংঘাতকে ‘ছোট গোল আলু’র সঙ্গে তুলনা করেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে যুদ্ধের গুরুত্ব খাটো করে দেখানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে তেহরান।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি ‘ছোট গোল আলুর জন্য বড় বিল দিচ্ছেন ট্রাম্প’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পর এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই বড় সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে পরিণত হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা, জ্বালানির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি কমে যাওয়া সমর্থন—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, সামরিক চাপের মাধ্যমে দ্রুত ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই হিসাব বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। মার্কিন হামলার পরও ইরান প্রতিরোধ অব্যাহত রাখায় যুদ্ধ থামার বদলে আরও দীর্ঘ হয়েছে। এর ফলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ও বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে দীর্ঘ সময় অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে পড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ ব্যবহার করতে হচ্ছে। সেনা মোতায়েন, সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের মতো খাতেও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এসব আর্থিক চাপ দ্রুত কমবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। মেহের নিউজের প্রতিবেদনে একটি সাম্প্রতিক জরিপের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে ৬৪ শতাংশ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমন পরিস্থিতি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির অভ্যন্তরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প ইরান সংঘাতকে যতই ছোট করে উপস্থাপন করুন না কেন, মেহের নিউজের বিশ্লেষণ বলছে—দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি