ঢাকা    মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla Lead

আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ ও ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখা, ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।নতুন মূল্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এ দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হওয়ার কথা। তবে সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন এবং সেচনির্ভর কৃষকের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এর চেয়ে অনেক কম দামে ডিজেল সরবরাহ করছে।ফলে নতুন মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো মূল্যচাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর না দিয়ে সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দামের একটি বড় অংশ বহন করছে।এর আগে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিপিসি অতীতে অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ সংরক্ষণ করে রাখায় দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে তেল বিক্রি করেও বড় অঙ্কের লোকসান সামাল দিতে পেরেছে।সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আমেরিকা-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এ রুটের ওপর নির্ভরশীল বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।একই সময়ে ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলেও। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি পরিবহনের সময় ও ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বীমা ব্যয় এবং ফ্রেইট চার্জও বেড়েছে।জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান বিপিসির আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছিল।মূল্য সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলেই বার্ষিক লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারত বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।বহুগুণ বেড়েছে জাহাজ ভাড়াআন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেট চার্জ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দেশে তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম।তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজ ভাড়াও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দেশে তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।বিপিসির চেয়ারম্যান জানান, গত ছয় মাসে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই লোকসানের ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের জ্বালানি খাতের ওপর বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারত।রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু তেলের মূল দাম নয়, এটি হ্যান্ডেলিংয়ের খরচও অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে মূল্য সমন্বয় না করে আগের দাম ধরে রাখলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হতো।জ্বালানি তেল বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।এতে একদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের অপচয়ের আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির সুবিধা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিজেলের দাম বিভিন্ন আঞ্চলিক ও এশীয় দেশের তুলনায় কম। বাংলাদেশি মুদ্রায় কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল সচিবালয়ে বলেন, বিপুল ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অর্থায়নের সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেল প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।তার মতে, এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা নির্ধারণ করতে হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন এবং সেচনির্ভর কৃষকের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করছে।অর্থাৎ, নতুন করে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত মূল্যচাপ পুরোপুরি ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি। বরং প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি বহন করছে।জ্বালানি বিভাগ আরও জানিয়েছে, অতীতে বিপিসির অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ সংরক্ষিত থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের লোকসান সত্ত্বেও এতদিন মূল্য না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম সমন্বয় না করে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করায় বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।এতে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন আরও টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।সরকারের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পুরো চাপ যাতে জনগণের ওপর না পড়ে, একই সঙ্গে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারের অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক ব্যয়ও যাতে ব্যাহত না হয়। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার দাম সমন্বয়ের সুযোগসরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমে এলে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম পুনরায় সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।অর্থাৎ, বর্তমান মূল্য সমন্বয়কে স্থায়ীভাবে উচ্চমূল্য ধরে রাখার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার।অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে নজরদারিজ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র যাতে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া আদায় বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মাধ্যমে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।সরকারের লক্ষ্য, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের অনিবার্য প্রভাব যাতে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় ও ভর্তুকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, বিপিসির আর্থিক অবস্থা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই মূল্য সমন্বয়ের নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।‘তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া ভালো বিকল্প ছিল না’বিপিসির আর্থিক সংকট ও দেশে সম্ভাব্য জ্বালানি ঘাটতি এড়াতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে ভালো কোনো বিকল্প ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।বাসসকে তিনি বলেন, বিপিসির আর্থিক সংকট এবং দেশে সম্ভাব্য জ্বালানি ঘাটতি এড়াতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে অন্য কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ মূল্যের কারণে দেশীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।তিনি আরও বলেন, সরকার যদি এখন তেল আমদানি করতে না পারত, তাহলে দেশ আরও বড় ও ভয়াবহ সংকটে পড়ত। এর ফলে দেশের প্রতিটি নাগরিককে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো।বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ড. ইজাজ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হবে না। বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় ধরনের ‘শক’ বা ধাক্কা হলেও সাময়িকভাবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ ও ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়