রাস্তাঘাটহীন ঝোপঝাড় আর ঘন জঙ্গলের ভেতরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অধিকাংশ শাখা ডাকঘর। নেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি, প্রতিটি কার্যালয়ের দরজায় ঝুলছে স্থায়ী তালা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার বা জনসমাগমের স্থান এড়িয়ে পোস্টমাস্টারদের নিজস্ব দান করা গুরুত্বহীন জমিতে এসব ভবন গড়ে তোলায় সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে উপজেলার গ্রামীণ ডাকসেবায় এক বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের ভূটিয়ারকোনা ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি পুরোপুরি বনাঞ্চলের ভেতর লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়ে রয়েছে। পাশেই উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থাকলেও ডাকঘরে প্রবেশের কোনো সুনির্দিষ্ট রাস্তা নেই। কার্যালয়ের মূল ফটক আগাছা আর পরগাছায় ঢেকে গেছে, সামনে আবর্জনা ও গোবর জমে তৈরি হয়েছে গোচারণ ভূমি। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যালয়ে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে আসতে দেখা যায়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে কিল্লাতাজপুর, মুখুরিয়া, লামাপাড়া, ভবানীপুর, রামগোপালপুর, পাছারবাজার, শাহগঞ্জ ও বীরআহাম্মদপুর শাখা ডাকঘরে। প্রতিটি কার্যালয়ে সরকার আধুনিকায়নের জন্য সৌরবিদ্যুৎ, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সরবরাহ করলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পোস্ট অফিসগুলোতে এখন কেবল সরকারি-বেসরকারি চাকরির প্রবেশপত্র, আদালতের নোটিশ এবং আইনি কাগজপত্র আসে। বছরের পর বছর কোনো তরুণ-তরুণীর প্রেমপত্র না এলেও বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
উপজেলার পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. আতাউর রহমান জানান, ১৯৯১ সাল থেকে তিনি কর্মরত আছেন। একসময় চিঠির অপেক্ষায় তরুণ-তরুণীরা পথ চেয়ে থাকত এবং বকশিস দিত। কিন্তু মোবাইল ফোনের প্রসারে সেই দিন হারিয়ে গেছে। এখন মাসে ১৪-১৫টি তালাকনামা আসে, অথচ গত দুই-তিন বছরে একটিও প্রেমপত্র আসেনি। পাশাপাশি মাত্র ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতনে দায়িত্ব পালন করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমিনুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রতি মাসে ৮০ টাকা অফিস খরচ বরাদ্দ পাওয়া যায়, যা দিয়ে স্ট্যাপলারের পিন কেনাও সম্ভব হয় না। বাজেট সংকটের মধ্যেও কাজ চালানোর চেষ্টা চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, উপজেলার ১৪টি শাখা এবং প্রধান ডাকঘর মিলিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকপত্র আসে, যার সংখ্যা বছরে প্রায় দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়। তালাবদ্ধ ও জরাজীর্ণ শাখাগুলোর বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।