ঢাকা    শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla Lead

১৭২৪ সালের মানমন্দির থেকে ভারতের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু যন্তর মন্তর



১৭২৪ সালের মানমন্দির থেকে ভারতের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু যন্তর মন্তর
সংগৃহীত ছবি
ফলো করুন

১৭২৪ সালে মহারাজা সওয়াই জয়সিংহের হাত ধরে মহাজাগতিক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সময় পরিমাপের জন্য নির্মিত হয়েছিল দিল্লির প্রাচীন মানমন্দির ‘যন্তর মন্তর’। তিন শতাব্দী পর ২০২৬ সালে এসে সেই ঐতিহাসিক লাল পাথরের চত্বরটি আবারও বিশ্বমঞ্চে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্মের ‘জেন-জি’ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। যেখানে একসময় সম্রাট জয়প্রকাশ যন্ত্র আকাশের নক্ষত্র মেপে সময় নির্ধারণ করত, সেখানেই আজ রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্বের হিসাব কষছেন অধিকারকামী মানুষ।

দিল্লির কনট প্লেসের কাছাকাছি পার্লামেন্ট মার্গ সরণির এই বাঁকানো রাস্তাটি বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে লন্ডনের হাইড পার্কের সমতুল্য হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক অবস্থান থেকে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন এই ভূখণ্ডেই আছড়ে পড়ায় যন্তর মন্তর নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।

যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদস্থলে রূপান্তরের পেছনে রয়েছে দিল্লির রাজনৈতিক ভূগোল পরিবর্তনের ইতিহাস। ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত ভারতের প্রধান বিক্ষোভ মঞ্চ ছিল রাষ্ট্রপতি ভবন ও সংসদ ভবনের সন্নিকটে অবস্থিত ‘বোট ক্লাব’। তবে ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে লাখো কৃষকের সপ্তাহব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি ক্ষমতার অলিন্দ কাঁপিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় বোট ক্লাব থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। ঠিক তখনই সংসদ ভবনের কাছাকাছি অথচ নজরদারির সুবিধাজনক দূরত্বে থাকা যন্তর মন্তরকে একটি সমঝোতামূলক বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

নব্বইয়ের দশকে মেধা পাটকরের নেতৃত্বে ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’, ২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন, ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে তরুণদের তীব্র ক্ষোভ, ২০১৫ সালে সাবেক সেনাসদস্যদের ‘এক পদ, এক পেনশন’ (ওআরওপি) আন্দোলন এবং ২০১৭ সালে খরাকবলিত তামিলনাড়ুর কৃষকদের নাটকীয় অনশন—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই প্রাঙ্গণ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার বছরে এখানে ১৩ হাজারেরও বেশি ধর্না ও সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২০১৭ সালে শব্দদূষণ ও নাগরিক ভোগান্তির কারণে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল এখানে অবস্থান কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রামলীলা ময়দানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার ও আবাসিক জীবনের ভারসাম্যের ওপর জোর দেয়। বিজ্ঞান আর রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল মেলবন্ধন হিসেবে যন্তর মন্তর আজও দিল্লির বুকে সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকের ক্ষমতার দরবারে আওয়াজ তোলার প্রতীকী মঞ্চ।

সূত্র: ঐতিহাসিক গবেষণা নথি, সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

ট্যাগ : যন্তর মন্তর দিল্লি ককরোচ আন্দোলন

Bangla Lead

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


১৭২৪ সালের মানমন্দির থেকে ভারতের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু যন্তর মন্তর

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

১৭২৪ সালে মহারাজা সওয়াই জয়সিংহের হাত ধরে মহাজাগতিক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সময় পরিমাপের জন্য নির্মিত হয়েছিল দিল্লির প্রাচীন মানমন্দির ‘যন্তর মন্তর’। তিন শতাব্দী পর ২০২৬ সালে এসে সেই ঐতিহাসিক লাল পাথরের চত্বরটি আবারও বিশ্বমঞ্চে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে তরুণ প্রজন্মের ‘জেন-জি’ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। যেখানে একসময় সম্রাট জয়প্রকাশ যন্ত্র আকাশের নক্ষত্র মেপে সময় নির্ধারণ করত, সেখানেই আজ রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্বের হিসাব কষছেন অধিকারকামী মানুষ।

দিল্লির কনট প্লেসের কাছাকাছি পার্লামেন্ট মার্গ সরণির এই বাঁকানো রাস্তাটি বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে লন্ডনের হাইড পার্কের সমতুল্য হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক অবস্থান থেকে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন এই ভূখণ্ডেই আছড়ে পড়ায় যন্তর মন্তর নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।

যন্তর মন্তরের এই প্রতিবাদস্থলে রূপান্তরের পেছনে রয়েছে দিল্লির রাজনৈতিক ভূগোল পরিবর্তনের ইতিহাস। ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত ভারতের প্রধান বিক্ষোভ মঞ্চ ছিল রাষ্ট্রপতি ভবন ও সংসদ ভবনের সন্নিকটে অবস্থিত ‘বোট ক্লাব’। তবে ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে লাখো কৃষকের সপ্তাহব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি ক্ষমতার অলিন্দ কাঁপিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় বোট ক্লাব থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। ঠিক তখনই সংসদ ভবনের কাছাকাছি অথচ নজরদারির সুবিধাজনক দূরত্বে থাকা যন্তর মন্তরকে একটি সমঝোতামূলক বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

নব্বইয়ের দশকে মেধা পাটকরের নেতৃত্বে ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’, ২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন, ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে তরুণদের তীব্র ক্ষোভ, ২০১৫ সালে সাবেক সেনাসদস্যদের ‘এক পদ, এক পেনশন’ (ওআরওপি) আন্দোলন এবং ২০১৭ সালে খরাকবলিত তামিলনাড়ুর কৃষকদের নাটকীয় অনশন—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই প্রাঙ্গণ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার বছরে এখানে ১৩ হাজারেরও বেশি ধর্না ও সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২০১৭ সালে শব্দদূষণ ও নাগরিক ভোগান্তির কারণে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল এখানে অবস্থান কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রামলীলা ময়দানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার ও আবাসিক জীবনের ভারসাম্যের ওপর জোর দেয়। বিজ্ঞান আর রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল মেলবন্ধন হিসেবে যন্তর মন্তর আজও দিল্লির বুকে সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকের ক্ষমতার দরবারে আওয়াজ তোলার প্রতীকী মঞ্চ।

সূত্র: ঐতিহাসিক গবেষণা নথি, সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।


Bangla Lead

সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাঃ উবায়দুল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা লিড