এক বিধবা নারীকে একাধিকবার ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চার দিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার দুপুরে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই দিন বিকালেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর এই নির্দেশ দেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জেলা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কড়া নজরদারি এবং নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিসানকে কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক তৈয়ব উদ্দিন আহমেদের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে আনা-নেওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তার মাথায় হেলমেট ও পরনে পুলিশের বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানো ছিল। শুনানির পর আদালত থেকে নামানোর সময়ও অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তাকে প্রিজন ভ্যানে উঠিয়ে নেয় পুলিশ।
আদালতের কার্যক্রম শেষে জিসানের আইনজীবী মনির হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা জিসানের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাকে কারা হাসপাতালে রাখার আবেদন করেছিলাম। এসময় বিজ্ঞ আদালত আমাদের কাছে ওকালতনামা দেখতে চান। ওকালতনামা সম্পন্ন করার জন্য আমরা পুলিশ কাস্টডিতে থাকা জিসানের সই নিতে চাইলে ডিবি ও জেলা পুলিশ আমাদের সেই সুযোগ দেয়নি। তারা তড়িঘড়ি করে সাংবাদিকসহ সবাইকে ধাক্কা দিয়ে জিসানকে প্রিজন ভ্যানে উঠিয়ে ফেলে। পুলিশের এমন আচরণেই পরিষ্কার বুঝা যায় তারা কোনো কিছু লুকাতে চাইছে।’
এর আগে, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর গত শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে শিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানকে উদ্ধারের দাবি করে তার পরিবার। উদ্ধারের পরপরই ওই দিন রাতেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে জিসানকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর গত শুক্রবার রাতেই ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় করা এই মামলাটিতে মোট চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে ওই নারীকে বিয়ের প্রলোভনে একাধিকবার ধর্ষণ ও জোর করে ভ্রূণ নষ্ট করার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় প্রধান আসামি জিসান ছাড়াও গ্রেপ্তার হওয়া অন্য তিন আসামি হলেন সেকান্দর আলী (২৪), গোলাম রাব্বী (২৬) ও সজীব হাসান (২১)। তাদের সবার বাড়িই দাউদকান্দি উপজেলায়। এই তিন আসামিকে গত শনিবার বিকালেই কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে পুলিশ রেকর্ডে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও জিসান প্রধান নিজেকে অসুস্থ দাবি করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় এতদিন তাকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট জানিয়ে গত শনিবার জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলেন, গত ১১ জুন রাতে জিসান নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়ে তার চাচাতো ভাই অ্যাডভোকেট রাসেল আহম্মেদ দাউদকান্দি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডির সূত্র ধরে জেলা পুলিশের একাধিক দল তাকে উদ্ধারে মাঠে নামে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তৎপরতা শুরু করে।
অনুসন্ধানকালে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে এক বিধবা তরুণীর (২৫) সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয় এবং একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের জেরে ওই তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাকে ভ্রূণ নষ্ট করার জন্য মানসিক চাপ দেন এবং ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভপাত ঘটানো হয়। পরে ওই তরুণী জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি বাধ্য হয়ে ১২ জুন বিয়ে করবেন বলে সম্মতি জানান। তবে শেষ মুহূর্তে বিয়ে এড়াতে ও দায় এড়াতে ১১ জুন রাতেই তিনি নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। নিখোঁজের সেই অনুসন্ধান চলাকালেই গত শুক্রবার রাতে লাকসাম এলাকা থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে, যা পরবর্তীতে ধর্ষণ মামলার মূল রহস্য উন্মোচন করে।