ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যা কমাতে সরকারের নতুন পরিকল্পনা কী?
ব নাগরিকের জন্য নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থান নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নাগরিকদের জন্য কেবল একটি ঘরের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; সেই বাসস্থানকে নিরাপদ, টেকসই ও বসবাসের উপযোগী করে তোলাও বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বসতি দিবসের বিষয়টি শুধু একটি বাড়ি বা ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন, গণপরিবহন, সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয় সরাসরি যুক্ত। এসব সুবিধার পাশাপাশি মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে নিরাপদ পরিবেশও প্রয়োজন।তারেক রহমান বলেন, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।তিনি বলেন, বাংলাদেশের শহর, বন্দর ও নগরগুলোতে মানুষের বসতি ক্রমাগত বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে রয়েছে এবং দেশের অন্যান্য বড় শহরেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক শহরেই স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মানুষ বসবাস করছেন।এমন পরিস্থিতিতে ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ ধারণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, নগর এলাকায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব এবং সুপরিকল্পিত শহর গড়ে তোলা জরুরি।তবে পরিকল্পনার কথা বলা যতটা সহজ, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, সর্বজনীন বাসস্থান ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।তারেক রহমান বলেন, সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত এবং প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবা-সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থান নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন গড়ে তুলতে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করছে।পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্যও বাসযোগ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থা সরকারের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিশ্চিত করা এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার বলেও জানান তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জের জন্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১১ নম্বর অভীষ্ট অর্জনের পথও সহজ হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমাতে সরকার বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলেও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য শহরের সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে শহরমুখী মানুষের চাপ কমানো সম্ভব। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান নগরায়ণ কাঠামোয় রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত ও ভারসাম্যপূর্ণ নগর এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।এ লক্ষ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সারাদেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং রাজধানী ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।বাসযোগ্য আবাসন তৈরির ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার কাজ চলছে।তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখোমুখি করছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির মধ্যেও নগর এলাকার সংকট মোকাবিলা এবং বিশেষ করে সর্বজনীন আবাসন নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।তবে দেশের নগর ও শহরাঞ্চলের আবাসন সংকট এককভাবে সরকারের পক্ষে সমাধান করা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করা গেলে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।সবার জন্য মৌলিক সেবা-সুবিধাসহ বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ব্লকভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলোতে পার্ক ও খেলার মাঠের মতো উন্মুক্ত স্থান রাখার এবং নির্ধারিত জোনে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।শেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকার পর্যায়ক্রমে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’ শুধু একটি লক্ষ্য বা প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে না; বরং তা দেশের নাগরিকদের জন্য বাস্তবতায় পরিণত হবে।