রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করলে কি অজু ভেঙে যায়?
দৈনন্দিন জীবনে চিকিৎসাসেবা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমাদের প্রায়শই রক্ত দিতে হয়। রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা, ল্যাব টেস্ট কিংবা মুমূর্ষু রোগীকে রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীর থেকে রক্ত বের করা একটি সাধারণ বিষয়। তবে রক্ত বের হলে অজু থাকবে কি না— তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে থাকেন। পবিত্রতা ও ইবাদতের সঠিকতা নিশ্চিত করতে এই বিষয়ে ইসলামি শরীয়তের মৌলিক বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার জন্য যদি সুঁচ বা সিরিঞ্জ ফুটানোর পর যদি সামান্য রক্ত বের হয়ে ছিদ্রের মুখেই জমে থাকে এবং বাইরে প্রবাহিত হওয়ার মতো পরিমাণ না হয়, তবে অজু ভাঙবে না। আর যদি ছিদ্রের মুখ ছাড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে কিংবা সিরিঞ্জে গড়িয়ে পড়ার মতো পরিমাণে রক্ত সংগৃহীত হয়, তবে নিশ্চিতভাবে অজু ভেঙে যাবে এবং নতুন করে অজু করতে হবে।রক্ত বের হওয়া ও অজু ভঙ্গের মূল বিধানরক্ত শরীর থেকে বের হলে অজু থাকবে কি না, তা মূলত বের হওয়া রক্তের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, রক্ত যদি শরীর থেকে বের হয়ে গড়িয়ে পড়ার মতো হয়, তবেই অজু ভেঙে যাবে। রক্ত বের হয়ে চামড়ায় গড়িয়ে যাওয়া সরাসরি শর্ত নয়; বরং গড়িয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত যদি সিরিঞ্জের মাধ্যমে টেনে ব্যাগ বা টেস্টটিউবে নেওয়া হয়, তবে তাতেই অজু ভেঙে যাবে। তাই কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে রক্ত দিলে কিংবা ল্যাব টেস্টের জন্য সিরিঞ্জে করে রক্ত নিলেও অজু ভেঙে যায়।ইসলামি ফিকহের মূলনীতিতে শরীর থেকে প্রবাহিত রক্তকে অশুচিতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا`আপনি বলুন, আমার প্রতি যে ওহি নাজিল হয়েছে, তাতে ভক্ষণকারীর জন্য কোনো হারাম জিনিস পাই না; কেবল মৃতদেহ, প্রবাহিত রক্ত অথবা শূকরের মাংস ব্যতীত।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৪৫)রাসুলুল্লাহ (সা.) শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়লে পুনরায় অজু করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—الْوُضُوءُ مِنْ كُلِّ دَمٍ سَائِلٍ‘প্রতিটি প্রবাহিত রক্তের কারণে অজু করা ওয়াজিব।’ (দারাকুতনি ৫৫৮)ফুকাহায়ে কেরামের মতামত ও কিতাবের রেফারেন্সইসলামি ফিকহের কিতাবগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালিজিয়ায় এসেছে—العلقة إذا أخذت بعض جلد إنسان ومصت، حتى امتلأ من دمه بحيث لو سقط لسال، انتقض الوضوء؛ لأن الدم فيه سائل‘জোঁক যদি মানুষের শরীরের কোনো অংশে লেগে রক্ত চুষে নেয় এবং রক্তে এমনভাবে পূর্ণ হয়ে যায় যে, নিচে পড়ে গেলে রক্ত গড়িয়ে পড়ত, তবে অজু ভেঙে যাবে; কারণ এর ভেতরের রক্ত প্রবাহিত হওয়ার যোগ্য।’ (আল-ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালিজিয়া ১/৪৭)অজুর হুকুমের বিস্তারিত বিবরণপ্রবাহিত না হলে: সুঁচ বা সিরিঞ্জ ফুটানোর পর যদি সামান্য রক্ত বের হয়ে ছিদ্রের মুখেই জমে থাকে এবং বাইরে প্রবাহিত হওয়ার মতো পরিমাণ না হয়, তবে অজু ভাঙবে না।প্রবাহিত হলে: রক্ত বের হয়ে যদি ক্ষতস্থান বা ছিদ্রের মুখ ছাড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে কিংবা সিরিঞ্জে গড়িয়ে পড়ার মতো পরিমাণে রক্ত সংগৃহীত হয়, তবে নিশ্চিতভাবে অজু ভেঙে যাবে এবং নতুন করে অজু করতে হবে।অন্যান্য মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফি মাজহাব ছাড়া অন্য কিছু মাজহাবে সাধারণ রক্তক্ষরণে অজু ভাঙে না বলে মত রয়েছে। তবে আমাদের দেশে যেহেতু হানাফি ফিকহ ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়, তাই সতর্কতা ও বিশুদ্ধতার খাতিরে রক্ত গড়িয়ে পড়লে নতুন করে অজু করে নেওয়াই উত্তম ও পরামর্শযোগ্য।নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হলো পূর্ণাঙ্গ পবিত্রতা। তাই রক্ত দান বা পরীক্ষার পর রক্ত প্রবাহিত হলে নিয়ম অনুযায়ী পুনরায় অজু করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ইসলামি বিধানের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও তা দৈনন্দিন জীবনে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে পারি।