২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীতে সংঘটিত দুটি হত্যা এবং একটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা পৃথক তিন মামলার তদন্ত শেষে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় এসব মামলার এজাহারভুক্ত ৩০৩ জনকে দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
তদন্ত শেষে প্রস্তুতকৃত তিন মামলার অভিযোগপত্রে ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন হত্যা মামলায় ৪৩ জন, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী রায়হান আকন হত্যা মামলায় ৪৯ জন এবং অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসানকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনটি মামলার চার্জশিটেই প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি মামলাতেই সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইলিয়াস হত্যা মামলা (মোহাম্মদপুর থানা): ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট তিনি মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ফারুক খান সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ১০২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে মোহাম্মদপুর থানার এসআই আক্কেল আলী শেখ হাসিনাসহ ৪৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন এবং নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ৬৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন।
এ মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক এমপি সাদেক খান ও মাঈনুল হোসেন খান নিখিল। এ ছাড়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে আসামি করা হয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আগামী ১৬ নভেম্বর এ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
রায়হান আকন হত্যা মামলা (বাড্ডা থানা): অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিন ৫ আগস্ট দুপুরে বাড্ডা ইউলুপ এলাকায় গুলিতে নিহত হন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বনশ্রী শাখার কর্মী রায়হান আকন। এ ঘটনায় নিহতের বাবা কামাল হোসেন শেখ হাসিনাসহ ২৩৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন। তদন্ত শেষে বাড্ডা থানার এসআই সুমন মিয়া শেখ হাসিনাসহ ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন এবং বাকি ২৩৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন। এ মামলায় ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল ছাড়াও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও পিরোজপুর-৩ আসনের সাবেক এমপি শামীম শাহনেওয়াজকে আসামি করা হয়েছে।
মেহেদী হাসান হত্যাচেষ্টা মামলা (মোহাম্মদপুর থানা): ভোলার লালমোহন থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের ময়ূরভিলার সামনে গুলিতে ডান বাহু বিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান। এ ঘটনায় তাঁর করা মামলায় মোহাম্মদপুর থানার এসআই সেলিম উদ্দীন শেখ হাসিনাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। এ মামলায় ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদেক খান, আসিফ আহম্মেদ ও তারেকুজ্জামান রাজীবসহ স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার বাদী দ্রুত ন্যায়বিচার ও প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।