ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla Lead

সু'দে'র প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পাওয়া আয় কি জায়েজ?



সু'দে'র প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পাওয়া আয় কি জায়েজ?
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

জীবিকার তাগিদে মানুষ কত পথই না খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা লুকিয়ে থাকে তাঁর লোকমাটি হালাল কি না—তার ওপর। বর্তমান আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই এমন সব সংস্থায় কর্মরত, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদের সাথে জড়িত। বাধ্য হয়ে বা অজান্তে সুদি সংস্থায় কাজ করে অর্জিত টাকায় সংসার চালানো কি আদৌ জায়েজ? এই প্রশ্নটি কেবল আইনি বা ফিকহি কোনো বিতর্ক নয়, বরং এটি একজন ইমানদারের আত্মিক শান্তি ও আখিরাতের জবাবদিহিতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

সুদের ভয়াবহতা ও ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান

ইসলামে সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। স্পষ্ট সুদি বা সন্দেহযুক্ত সুদি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করা বৈধ হবে না। সুদি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সুদের লেনদেন, হিসাবরক্ষণ বা এসংক্রান্ত কাজ করার মাধ্যমে যে উপার্জন আসে, তা গ্রহণ করা এবং তা দিয়ে জীবন নির্বাহ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ, হারাম কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকও হারাম হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুদের কঠোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ

‘যারা সুদ খায়, তারা (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির মতো উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কেবল সুদ গ্রহণকারীই অপরাধী নয়; বরং এই ব্যবস্থার সঙ্গে যারা যেকোনোভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ায়, তারাও সমান পাপের অংশীদার। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অত্যন্ত স্পষ্ট—

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিসম্পাত করেছেন সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়ের ওপর। তিনি বলেছেন, ‘পাপের দিক থেকে তারা সবাই সমান।’ (মুসলিম ১৫৯৮)

পরিস্থিতি ও বিকল্পের সন্ধানে করণীয়

তবে জীবনের বাস্তবতায় কখনো কখনো মানুষ চরম বাধ্যবাধকতার মুখে পড়ে। শরিয়তের ফকিহদের মতে—

বিকল্প কাজের সন্ধান: সুদি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো অবিলম্বে একটি সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনের পথ খোঁজা।

সাময়িক বাধ্যবাধকতা: অন্য কোনো উপার্জনের মাধ্যম না পাওয়া পর্যন্ত সংসার চালানোর জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনে সেখানে থাকা অবস্থায় সার্বক্ষণিক তওবা করতে হবে এবং চাকরি পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সহযোগী কাজ: যদি সুদি ব্যাংকে এমন কোনো চাকরি হয় যা সরাসরি সুদের হিসাব বা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নয় (যেমন: নিরাপত্তা প্রহরী বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী), সেক্ষেত্রেও আলেমদের একটি অংশ একে অপছন্দনীয় বা মাকরুহ বলেছেন, কারণ এতে একটি হারাম ব্যবস্থার সহায়তা হয়। তাই সর্বাবস্থায় বিশুদ্ধ হালাল উপার্জনে ফিরে আসাই ইমানের দাবি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাঁর ভয়ে কেউ হারাম ত্যাগ করলে তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেবেন—

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যার ধারণা তার ছিল না।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ২-৩)

উপার্জনের পরিমাণের চেয়ে তার বিশুদ্ধতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অল্প হলেও হালাল রুজিতে যে বরকত ও শান্তি থাকে, কোটি টাকার হারাম উপার্জনে তা মিলবে না। সাময়িক অভাব বা কষ্টের ভয়ে হারাম পথ আঁকড়ে না ধরে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হালাল রিজিকের চেষ্টা করাই একজন সচেতন মুমিনের আসল পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের হারাম উপার্জন থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল পথে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন।

ট্যাগ : আখিরাত

Bangla Lead

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সু'দে'র প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পাওয়া আয় কি জায়েজ?

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

জীবিকার তাগিদে মানুষ কত পথই না খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা লুকিয়ে থাকে তাঁর লোকমাটি হালাল কি না—তার ওপর। বর্তমান আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকেই এমন সব সংস্থায় কর্মরত, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদের সাথে জড়িত। বাধ্য হয়ে বা অজান্তে সুদি সংস্থায় কাজ করে অর্জিত টাকায় সংসার চালানো কি আদৌ জায়েজ? এই প্রশ্নটি কেবল আইনি বা ফিকহি কোনো বিতর্ক নয়, বরং এটি একজন ইমানদারের আত্মিক শান্তি ও আখিরাতের জবাবদিহিতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

সুদের ভয়াবহতা ও ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান

ইসলামে সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। স্পষ্ট সুদি বা সন্দেহযুক্ত সুদি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করা বৈধ হবে না। সুদি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সুদের লেনদেন, হিসাবরক্ষণ বা এসংক্রান্ত কাজ করার মাধ্যমে যে উপার্জন আসে, তা গ্রহণ করা এবং তা দিয়ে জীবন নির্বাহ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কারণ, হারাম কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকও হারাম হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুদের কঠোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ

‘যারা সুদ খায়, তারা (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির মতো উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কেবল সুদ গ্রহণকারীই অপরাধী নয়; বরং এই ব্যবস্থার সঙ্গে যারা যেকোনোভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ায়, তারাও সমান পাপের অংশীদার। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অত্যন্ত স্পষ্ট—

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিসম্পাত করেছেন সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, সুদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়ের ওপর। তিনি বলেছেন, ‘পাপের দিক থেকে তারা সবাই সমান।’ (মুসলিম ১৫৯৮)

পরিস্থিতি ও বিকল্পের সন্ধানে করণীয়

তবে জীবনের বাস্তবতায় কখনো কখনো মানুষ চরম বাধ্যবাধকতার মুখে পড়ে। শরিয়তের ফকিহদের মতে—

বিকল্প কাজের সন্ধান: সুদি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো অবিলম্বে একটি সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনের পথ খোঁজা।

সাময়িক বাধ্যবাধকতা: অন্য কোনো উপার্জনের মাধ্যম না পাওয়া পর্যন্ত সংসার চালানোর জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনে সেখানে থাকা অবস্থায় সার্বক্ষণিক তওবা করতে হবে এবং চাকরি পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

সহযোগী কাজ: যদি সুদি ব্যাংকে এমন কোনো চাকরি হয় যা সরাসরি সুদের হিসাব বা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নয় (যেমন: নিরাপত্তা প্রহরী বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী), সেক্ষেত্রেও আলেমদের একটি অংশ একে অপছন্দনীয় বা মাকরুহ বলেছেন, কারণ এতে একটি হারাম ব্যবস্থার সহায়তা হয়। তাই সর্বাবস্থায় বিশুদ্ধ হালাল উপার্জনে ফিরে আসাই ইমানের দাবি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাঁর ভয়ে কেউ হারাম ত্যাগ করলে তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেবেন—

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যার ধারণা তার ছিল না।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ২-৩)

উপার্জনের পরিমাণের চেয়ে তার বিশুদ্ধতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অল্প হলেও হালাল রুজিতে যে বরকত ও শান্তি থাকে, কোটি টাকার হারাম উপার্জনে তা মিলবে না। সাময়িক অভাব বা কষ্টের ভয়ে হারাম পথ আঁকড়ে না ধরে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হালাল রিজিকের চেষ্টা করাই একজন সচেতন মুমিনের আসল পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের হারাম উপার্জন থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল পথে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন।


Bangla Lead

সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাঃ উবায়দুল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা লিড