ইসলামে নারীর শালীনতা, আত্মসম্মান ও পর্দা রক্ষা করা এক অনন্য আমানত। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন নারীর জন্য অনাত্মীয় বা পরপুরুষের সামনে সতরের অংশবিশেষ উন্মুক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে ইসলাম কোনো কঠিন বা কঠোর জীবনব্যবস্থা নয়; মানুষের জীবন রক্ষা ও সুস্থতার সুবিধার্থে এতে রয়েছে মানবিক নমনীয়তা ও সুবিবেচনা। অসুস্থতা বা চিকিৎসার মতো বিশেষ জরুরি মুহূর্তে এই সাধারণ নিয়মে শরিয়ত কিছুটা ছাড় দিয়েছে। জীবন রক্ষা ও শারীরিক সুস্থতার তাগিদে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনে শরীরের নির্দিষ্ট অংশ দেখানোর বিধান ইসলামি ফিকহে কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. জরুরি চিকিৎসায় মূল বিধান
সাধারণ নিয়মে অনাত্মীয় পুরুষকে শরীর দেখানো হারাম হলেও চিকিৎসাগত প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারকে নারী রোগীর শরীর বা প্রয়োজন সাপেক্ষে বিশেষ অংশ দেখানো শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। জরুরি অবস্থাকে ইসলামে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা জীবনের সুরক্ষায় অপারগতার নিয়ম তুলে ধরে বলেন—
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
‘তবে যে ব্যক্তি তীব্র বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি হয়— সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়ে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত না করে—তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৭৩)
২. নারী ডাক্তারের অনুপস্থিতি বা অপারগতা
রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথমে অভিজ্ঞ ও যোগ্য নারী ডাক্তারের সন্ধান করতে হবে। যদি উপযুক্ত নারী চিকিৎসক পাওয়া না যায়, কিংবা নারী ডাক্তারের চিকিৎসায় রোগ নিরাময় না হওয়ার বা শারীরিক জটিলতা বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে, কেবল তখনই পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া বৈধ হবে। সমমানের নারী ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও বিনা প্রয়োজনে বা অবহেলা করে পুরুষ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সাহাবিদের যুগেও যুদ্ধের মাঠে বা জরুরি প্রয়োজনে নারী সাহাবিরা পুরুষদের সেবা ও চিকিৎসা দিতেন। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত রুবায়্যি বিনতে মুআব্বিজ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
كُنَّا نَغْزُو مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم نَسْقِي الْقَوْمَ وَنَخْدُمُهُمْ وَنَرُدُّ الْقَتْلَى وَالْجَرْحَى إِلَى الْمَدِينَةِ
'আমরা নবী করীম (সা.)-এর সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করতাম। আমরা লোকজনকে পানি পান করাতাম, তাদের সেবা করতাম এবং নিহত ও আহতদের মদিনায় ফিরিয়ে আনতাম।’ (বুখারি ২৮৮৩)
৩. প্রয়োজনের সীমা নির্ধারণ
জরুরি পরিস্থিতিতে ছাড় দেওয়া হলেও তা অনিয়ন্ত্রিত নয়। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য শরীরের ঠিক যতটুকু অংশ দেখা বা স্পর্শ করা অপরিহার্য, পুরুষ ডাক্তার কেবল ততটুকুই দেখতে পারবেন। প্রয়োজন ছাড়া শরীরের অতিরিক্ত অংশ প্রকাশ করা কিংবা দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চিকিৎসককেও কেবল চিকিৎসার স্বার্থে দৃষ্টি দিয়ে বাকি সময়ে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফিকহের সর্বসম্মত নীতি হলো— ‘প্রয়োজনীয় ছাড় কেবল প্রয়োজনের পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’ (আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর)
৪. একাকী নির্জনবাস রোধে অভিভাবক বা সঙ্গীর উপস্থিতি
পুরুষ ডাক্তার যখন কোনো নারী রোগীকে পরীক্ষা করবেন, তখন ঘরে একাকী থাকা যাবে না। সেখানে অবশ্যই রোগীর স্বামী, কোনো মাহরাম পুরুষ (যাদের সঙ্গে বিবাহ হারাম) অথবা কোনো বিশ্বাসযোগ্য নারী (অন্য কোনো নারী স্বজন বা নারী নার্স) উপস্থিত থাকতে হবে। এতে করে ইসলামের নিষিদ্ধ নির্জনবাস বা ‘খিলওয়াত’ থেকে মুক্ত থাকা নিশ্চিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একাকী পরপুরুষ ও পরনারীর অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—
لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ
‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে তার মাহরাম পুরুষ উপস্থিত থাকা ব্যতীত একাকী নির্জনে অবস্থান না করে।’ (বুখারি ৫২৩৩, মুসলিম ১৩৪১)
ইসলামি শরিয়ত মানুষের জানমালের সুরক্ষা ও নৈতিক বিশুদ্ধতা— দুইয়ের মাঝেই এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করেছে। অসুস্থতার সময় লজ্জা বা সংকোচ করে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি চিকিৎসার দোহাই দিয়ে পর্দার সীমারেখা ভুলে যাওয়াও অনুচিত। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে প্রথমে নারী চিকিৎসকের সন্ধান করা এবং বাধ্য হলে শরিয়তের নিয়ম মেনে পুরুষ চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমেই একজন মুমিন তার সুস্থতা ও আমানতদারিতা উভয়ই বজায় রাখতে পারেন।