ঢাকা    রোববার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩
Bangla Lead

খাবার তালিকা থেকে চিনি একেবারে বাদ দিলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনবে: গবেষণা


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬

খাবার তালিকা থেকে চিনি একেবারে বাদ দিলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনবে: গবেষণা
খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সবসময় উপকারি নাও হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

চিনি বা শর্করা খাওয়া কমানো সাধারণত স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি মনে করা হলেও, একটি নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সবসময় উপকারি নাও হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর অপ্রত্যাশিত ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় অনুষ্ঠিত ‘এন্ডো ২০২৬’ চিকিৎসা সম্মেলনে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষকরা মূলত প্রাণীদের ওপর খাদ্যতালিকা থেকে সুক্রোজ—যা সাধারণ টেবিল সুগার বা চিনি নামে পরিচিত—সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রভাব নিয়ে এই পরীক্ষাটি চালান। 

গবেষকরা ইঁদুরের ওপর দীর্ঘ ১৬ সপ্তাহ ধরে এই গবেষণা পরিচালনা করেন। এ জন্য ইঁদুরগুলোকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। 

প্রথম দলের ইঁদুরগুলোকে কম চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, যার মধ্যে চিনি (সুক্রোজ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দলের ইঁদুরগুলোকেও প্রায় একই রকম কম চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, তবে তাতে কোনো চিনি ছিল না। 

১৬ সপ্তাহের এই পুরো সময় জুড়ে উভয় দলের ইঁদুরের শরীরের ওজন প্রায় একই রকম ছিল। তবে বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়—যারা সম্পূর্ণ চিনিহীন খাবার খেয়েছিল, তাদের শরীরে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। 

গবেষকদের তথ্যমতে, চিনি থেকে বঞ্চিত ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তাদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। 

আরও পড়ুনআরও পড়ুনরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপাকতন্ত্রের সুরক্ষায় জামের যত উপকারিতা

মেটাবলিক ডিসফাংশন বা বিপাকীয় এই কর্মহীনতা ইঙ্গিত করে যে, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ দূর করে দিলে শরীর তার শক্তি প্রক্রিয়াকরণ এবং তা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। 

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি 

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চিনি বর্জনকারী ইঁদুরগুলোর অন্ত্রে থাকা উপকারি ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি তাদের অন্ত্রে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বৃদ্ধির লক্ষণও দেখা গেছে।

গবেষকদের মতে, মানুষের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া পুরো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে চিনি একেবারে বাদ দেওয়ার সঙ্গে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার একটি সরাসরি যোগসূত্র থাকতে পারে।

লিভারেও ক্ষতিকর পরিবর্তন 

বিপাকীয় এবং পরিপাকতন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি, চিনিহীন খাবার খাওয়া ইঁদুরগুলোর লিভার বা যকৃতেও পরিবর্তন ধরা পড়েছে। গবেষকরা জানান, এই পরিবর্তনগুলো সাধারণত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা লিভারে চর্বি জমার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি খাদ্যতালিকা থেকে নির্দিষ্ট কোনো উপাদান পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

প্রয়োজন সুষম খাদ্যতালিকা

প্রধান গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, এই ফলাফলগুলো মূলত একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্যের গুরুত্বকে তুলে ধরে। গবেষণা দলের মতে, কেবল একটি উপাদানকে জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দিলেই শরীর সুস্থ হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়; বরং এটি শরীরের মেটাবলিক সিস্টেমে উল্টো ও অপ্রত্যাশিত ধাক্কা দিতে পারে। সুক্রোজ সম্পূর্ণ বাদ দিলে তা উপকারী অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার গঠনকে ব্যাহত করে, যা সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। 

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যেহেতু এই গবেষণাটি প্রাণীদের (ইঁদুর) ওপর করা হয়েছে, তাই এর ফলাফল এখনই সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। যারা চিনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম প্রভাব পড়ে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরও বিস্তারিত মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণার প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—ভবিষ্যতের ডায়েট চার্ট বা খাদ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলো শুধুমাত্র চিনি বর্জনের ওপর জোর না দিয়ে সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য, স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ওপর ফোকাস করা উচিত। 

অতিরিক্ত চিনি খাওয়া অবশ্যই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবে সব পরিস্থিতিতে এটি সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়তো সেরা কৌশল নাও হতে পারে। বরং পরিমিতিবোধ এবং একটি সুষম খাদ্যতালিকাই দীর্ঘমেয়াদে ভালো স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। 

সূত্র: সামা টিভি 

ট্যাগ : চিনি

Bangla Lead

রোববার, ২১ জুন ২০২৬


খাবার তালিকা থেকে চিনি একেবারে বাদ দিলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনবে: গবেষণা

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

featured Image

চিনি বা শর্করা খাওয়া কমানো সাধারণত স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি মনে করা হলেও, একটি নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সবসময় উপকারি নাও হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর অপ্রত্যাশিত ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় অনুষ্ঠিত ‘এন্ডো ২০২৬’ চিকিৎসা সম্মেলনে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষকরা মূলত প্রাণীদের ওপর খাদ্যতালিকা থেকে সুক্রোজ—যা সাধারণ টেবিল সুগার বা চিনি নামে পরিচিত—সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রভাব নিয়ে এই পরীক্ষাটি চালান। 

গবেষকরা ইঁদুরের ওপর দীর্ঘ ১৬ সপ্তাহ ধরে এই গবেষণা পরিচালনা করেন। এ জন্য ইঁদুরগুলোকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। 

প্রথম দলের ইঁদুরগুলোকে কম চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, যার মধ্যে চিনি (সুক্রোজ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দলের ইঁদুরগুলোকেও প্রায় একই রকম কম চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, তবে তাতে কোনো চিনি ছিল না। 

১৬ সপ্তাহের এই পুরো সময় জুড়ে উভয় দলের ইঁদুরের শরীরের ওজন প্রায় একই রকম ছিল। তবে বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়—যারা সম্পূর্ণ চিনিহীন খাবার খেয়েছিল, তাদের শরীরে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। 

গবেষকদের তথ্যমতে, চিনি থেকে বঞ্চিত ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তাদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। 

আরও পড়ুনআরও পড়ুনরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপাকতন্ত্রের সুরক্ষায় জামের যত উপকারিতা

মেটাবলিক ডিসফাংশন বা বিপাকীয় এই কর্মহীনতা ইঙ্গিত করে যে, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ দূর করে দিলে শরীর তার শক্তি প্রক্রিয়াকরণ এবং তা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। 

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি 

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চিনি বর্জনকারী ইঁদুরগুলোর অন্ত্রে থাকা উপকারি ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি তাদের অন্ত্রে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বৃদ্ধির লক্ষণও দেখা গেছে।

গবেষকদের মতে, মানুষের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া পুরো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে চিনি একেবারে বাদ দেওয়ার সঙ্গে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার একটি সরাসরি যোগসূত্র থাকতে পারে।

লিভারেও ক্ষতিকর পরিবর্তন 

বিপাকীয় এবং পরিপাকতন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি, চিনিহীন খাবার খাওয়া ইঁদুরগুলোর লিভার বা যকৃতেও পরিবর্তন ধরা পড়েছে। গবেষকরা জানান, এই পরিবর্তনগুলো সাধারণত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা লিভারে চর্বি জমার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি খাদ্যতালিকা থেকে নির্দিষ্ট কোনো উপাদান পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

প্রয়োজন সুষম খাদ্যতালিকা

প্রধান গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, এই ফলাফলগুলো মূলত একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্যের গুরুত্বকে তুলে ধরে। গবেষণা দলের মতে, কেবল একটি উপাদানকে জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দিলেই শরীর সুস্থ হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়; বরং এটি শরীরের মেটাবলিক সিস্টেমে উল্টো ও অপ্রত্যাশিত ধাক্কা দিতে পারে। সুক্রোজ সম্পূর্ণ বাদ দিলে তা উপকারী অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার গঠনকে ব্যাহত করে, যা সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। 

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যেহেতু এই গবেষণাটি প্রাণীদের (ইঁদুর) ওপর করা হয়েছে, তাই এর ফলাফল এখনই সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। যারা চিনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই রকম প্রভাব পড়ে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরও বিস্তারিত মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণার প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—ভবিষ্যতের ডায়েট চার্ট বা খাদ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলো শুধুমাত্র চিনি বর্জনের ওপর জোর না দিয়ে সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য, স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ওপর ফোকাস করা উচিত। 

অতিরিক্ত চিনি খাওয়া অবশ্যই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবে সব পরিস্থিতিতে এটি সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়তো সেরা কৌশল নাও হতে পারে। বরং পরিমিতিবোধ এবং একটি সুষম খাদ্যতালিকাই দীর্ঘমেয়াদে ভালো স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। 

সূত্র: সামা টিভি 


Bangla Lead

সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাঃ উবায়দুল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা লিড