প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
‘আগে খরচ, পরে অনুমোদন’ প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
অর্থবছরের শেষ সময়ে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার আগে অর্থ ব্যয় করে পরে সংসদের অনুমোদন চায়। এতে সংসদের কার্যকর ভূমিকা ও সার্বভৌমত্ব সীমিত হয়ে পড়ে।সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সম্পূরক বাজেটের ২৫টি মঞ্জুরি দাবির ওপর ভোট গ্রহণ শুরু হয়।স্পিকার জানান, ২০ জন সংসদ সদস্য এসব দাবির বিপরীতে মোট ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছেন।আলোচনার শুরুতে ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, খরচ করার পর অনুমোদন নেওয়ার এই চর্চা দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে বন্ধ হওয়া দরকার।পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান পরিকল্পনা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় একই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নামে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা পরে সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে আনা হয়।তিনি বলেন, সরকার আগে খরচ করে, এরপর সেটি সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে পেশ করা হয়। তখন সংসদের সামনে তা পাস করা ছাড়া কার্যত আর কোনো পথ থাকে না।সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এর প্রসঙ্গ টেনে নাজিবুর রহমান বলেন, আইনে সংশোধিত বাজেট যথাসম্ভব প্রতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যে পেশ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘যথাসম্ভব’ শব্দটির সুযোগ নিয়ে জুন মাসে এটি আনা হচ্ছে। মার্চ বা এপ্রিলে কেন সংশোধিত বাজেট দেওয়া গেল না, তার ব্যাখ্যা সরকারের দেওয়া উচিত।বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল আলিম বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সম্পূরক বাজেটের প্রয়োজন হতো না। তিনি ‘আগে অনুমোদন, পরে খরচ’ নীতি চালুর দাবি জানান।তাঁর অভিযোগ, অর্থবছরের শেষদিকে তাড়াহুড়ো করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি করে।কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল গফুর অর্থ বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে বলেন, নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় সীমিত রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, সরকারি ব্যয়ে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও মিতব্যয়িতা ছিল না।সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, খরচের আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সংসদের কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হতো।তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় খরচের ক্ষেত্রে আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়া উচিত বলে তিনিও মনে করেন। তবে নানা কারণে তা সব সময় সম্ভব হয় না।স্পিকার আরও বলেন, প্রতিটি সংসদে এভাবে সম্পূরক বাজেট পাস হওয়া এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।অন্যদিকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সম্পূরক বাজেট মার্চ মাসে দেওয়া অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জুন মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত অর্থ খরচ চলতে থাকে। তাই সম্পূরক বাজেট জুন মাসেই দিতে হয়।তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনার মাধ্যমেই ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচ্য খাত নির্ধারণ করা হয়েছে।তবে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বাইরে যেন এমন বার্তা না যায় যে বিরোধী দল আলোচনা না করেই সব মেনে নিচ্ছে। বরং বিরোধী দল সংসদে জনগণের পক্ষে কথা বলছে, এই বার্তাটি যাওয়া দরকার।জবাবে স্পিকার বলেন, সব সদস্যকে বলার সুযোগ দিলে বাজেট অধিবেশন কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। সংসদীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমন সমঝোতা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে মোট ২৫টি মঞ্জুরি দাবি রয়েছে। স্পিকার জানান, সংবিধানের ৮৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়যুক্ত ব্যয় সংসদে আলোচনা হতে পারলেও তা ভোটের আওতায় পড়ে না।বিরোধী দলের তালিকা অনুযায়ী অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, এই আটটি খাতের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। অন্য দাবিগুলো সরাসরি ভোটে নিষ্পত্তি করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাঃ উবায়দুল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা লিড